
২৯ বসন্ত নেত্রকোনায় খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার পেল দুই গুণীজন
শারমিন আক্তারঃ
নেত্রকোনার আকাশে যখন বসন্তের রঙ ছড়িয়ে পড়েছে, তখন সেই রঙেই রাঙা হলো সম্মান ও স্মৃতির এক অনন্য আয়োজন। ২৯তম বসন্তকালীন উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত হলো খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান যেখানে শিকড়ের সঙ্গে গৌরবের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটল।
নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজের আয়োজনে শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত এই বর্ণাঢ্য আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান। তাঁর হাত থেকেই সম্মাননা গ্রহণ করেন ইতিহাস গবেষক আব্দুল্লাহ আল মাসুম। অসুস্থতার কারণে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে না পারায় দেশবরেণ্য কবি-সাহিত্যিক আবদুল হাই শিকদারের পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন দৈনিক যুগান্তরের নেত্রকোনা প্রতিনিধি কামাল হোসাইন।
সম্মাননা গ্রহণের পর আবেগঘন বক্তব্যে আব্দুল্লাহ আল মাসুম ফিরে যান তাঁর শৈশবের নেত্রকোনায়। আঞ্জুমান স্কুলের প্রাক্তন এই ছাত্র জানান, বিশ্বের অন্তত ১৪টি দেশ থেকে সম্মাননা ও ফেলোশিপ অর্জনের পরও জন্মভূমিতে পাওয়া এই স্বীকৃতি তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত নেত্রকোনায় কাটানো দিনগুলোর স্মৃতি এবং ছাত্রাবাস জীবনের কথা স্মরণ করতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে স্পষ্ট হয়ে ওঠে মাটির টান।
গবেষণার প্রসঙ্গে তিনি তুলে ধরেন মরহুম খালেকদাদ চৌধুরীর জীবন ও কর্মের অজানা দিক। কেবল কবি বা ইতিহাসচর্চায় সীমাবদ্ধ নন তিনি ছিলেন এক শিক্ষা সংস্কারক। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে মুসলিম নারী সমাজের অগ্রগতির লক্ষ্যে ‘নেত্রকোনা আঞ্জুমান বালিকা মাদ্রাসা’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ তাঁর দূরদর্শী চিন্তারই বহিঃপ্রকাশ এ তথ্য তিনি আর্কাইভ থেকে সংগৃহীত নথির ভিত্তিতে উপস্থাপন করেন।
নেত্রকোনার স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘ গবেষণায় উঠে এসেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নেত্রকোনা থানা প্রতিষ্ঠার সঠিক সময়কাল, পৌরসভার সূচনার ইতিহাস, প্রথম মুসলিম গ্র্যাজুয়েট এবং প্রথম মুসলিম পৌর চেয়ারম্যানের পরিচয়। ইতিহাসের এসব অনালোচিত অধ্যায় নতুন করে আলোচনায় এনে তিনি বলেন, গবেষণার উদ্দেশ্য কেবল তথ্য উদ্ধার নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখা।
বর্তমানে নেত্রকোনায় প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের প্রসঙ্গ টেনে তিনি জোর দেন সুশাসন ও নৈতিক শিক্ষার ওপর। তাঁর মতে, এসব প্রতিষ্ঠানে যদি গুড গভর্ন্যান্স ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা যায়, তবেই খালেকদাদ চৌধুরীর স্বপ্ন পূর্ণতা পাবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজের সভাপতি ম. কিবরিয়া চৌধুরী এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক কবি তানভীর জাহান চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কবি এ.বি.এম সোহেল রশিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী, প্রফেসর ননী গোপাল সরকার, কবি ও অভিনেত্রী সোনিয়া জাহান স্বপ্নসহ বিশিষ্টজনেরা। উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, কবি-সাহিত্যিক ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
বসন্তের আবহে এই আয়োজন কেবল একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান নয় এ ছিল ইতিহাস, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক গভীর পুনর্মূল্যায়ন। সম্মাননার মঞ্চে উঠে এদিন যেন নতুন করে উচ্চারিত হলো শিকড়কে ধারণ করেই এগিয়ে যেতে হয় ভবিষ্যতের পথে।