
গ্যাস কিট তৈরি করে চমক দেখিয়েছে সাতক্ষীরার এক স্কুল ছাত্রী
মিহিরুজ্জামান সাতক্ষীরাঃ
পরিবেশ বান্ধব গ্যাস সাশ্রয়ী কিট তৈরি করে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে এক চমক দেখিয়েছে সাতক্ষীরার এক স্কুল ছাত্রী। সাতক্ষীরা জেলার নবারুন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী রওশানি সিদ্দিকা তৈরি করেছে এমন একটি কিট,যা রান্নার কাজে গ্যাসের অপচয় রোধ করবে এবং খোলা জায়গাতেও চুলা নির্বিঘ্নে চালু রাখবে।
রওশানি বলেন,সাধারণ গ্যাস চুলায় রান্নার সময় প্রচুর পরিমাণে তাপ বাতাসে হারিয়ে যায়। ফলে গ্যাস খরচ বেশি হয় এবং সময়ও লাগে বেশি। তার তৈরি কিটটি এমন ভাবে তৈরি,যাতে চুলার চার পাশের তাপ আটকে রান্নায় ব্যবহার করা যায়। বিশেষ একটি স্তর ব্যবহার করে কিটটি এমন ভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যা বাতাসে চুলার আগুন নিভে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। নিজের উদ্ভাবনের পেছনের গল্প বলতে গিয়ে রওশানি আরও বলেন,আমার বাবা মোস্তাক আহম্মেদ সিদ্দিকী এক জন উদ্ভাবক। তিনি পরিবেশ বান্ধব সবুজ চুলা, জ্বালানি সাশ্রয়ী চুলা এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। ছোট বেলা থেকেই বাবার কাজ আমাকে খুব অনুপ্রাণিত করত। মনে হতো,আমিও এক দিন বাবার মতো কিছু তৈরি করবো,মানুষের উপকারে আসবে এমন কিছু উদ্ভাবন করবো। আমি এক দিন দেখলাম,আমার মা গ্যাসের চুলায় রান্না করছেন। কিন্তু বাতাসের কারণে চুলার আগুন এক দিকে ঢলে যাচ্ছে। আগুন ঠিক মতো বার্নারে না পড়ে, অনেক গ্যাস নষ্ট হচ্ছে। রান্নাও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক সময় নিচ্ছে। তখন থেকেই ভাবতে শুরু করি,কী ভাবে এই গ্যাসের অপচয় রোধ করা যায়? কী ভাবে এমন কিছু বানানো যায়, যাতে বাতাসেও রান্না করা সম্ভব হয়। এই চিন্তা মাথায় ঘুরতে থাকে। তার পর বাবার কারখানায় পড়ে থাকা কিছু টিন, হিটার শিল্ড আর হালকা ধাতব অংশ দিয়ে আমি পরীক্ষা মূলক ভাবে একটি কিট তৈরি করি। এই কিট চুলার চার পাশের তাপ ধরে রাখে,বাতাসে আগুন নিভে যেতে দেয় না। ফলে রান্না দ্রুত হয়, গ্যাসও সাশ্রয় হয়। তাপ বাইরে না ছড়ানোয় গায়ে লাগে না, সময়ও নষ্ট হয় না। এই উদ্ভাবনের মাধ্যমে আমি দেখাতে চাই, আমরা মেয়েরাও প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে পিছিয়ে নেই। আমি চাই ভবিষ্যতে আরও বড় কিছু তৈরি করতে,যা সমাজের কাজে লাগবে।
রওশানির সহপাঠী হোসনের আরা বলেন,রওশানি আমাদের সবার গর্ব। ও সব সময় নতুন কিছু ভাবতে ভালোবাসে। যখন সে প্রথম বলেছিল গ্যাসের অপচয় ঠেকানোর একটা কিট তৈরি করেছে, তখন আমরা বিশ্বাস করতে পারিনি। কিন্তু স্কুলের প্রদর্শনীতে যখন ওর কাজ দেখলাম, আমরা অবাক হয়ে গিয়েছি। খুব ছোট ও সহজ জিনিস দিয়ে এত বড় সমাধান এটা সত্যিই অসাধারণ। আমরা সবাই ওকে উৎসাহ দিচ্ছি, যেন আরও বড় কিছু করতে পারে।
রওশানির পিতা মোস্তাক আহম্মেদ সিদ্দিকী বলেন, আমি সব সময় চেয়েছি আমার সন্তানরা চিন্তা করতে শিখুক, বইয়ের বাইরেও ভাবুক। রওশানির এই সাফল্য আমাকে গর্বিত করেছে। সে ছোট বেলা থেকেই আমার কাজের প্রতি আগ্রহ দেখাতো সব সময় প্রশ্ন করতো, শিখতে চাইতো। আমার কারখানায় কাজ করতে করতে ওর চোখে যে আগ্রহ দেখতাম,তা আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। আমি চাই ও যেন নিজের ভাবনাকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে পারে। ওর উদ্ভাবনে যদি সমাজের উপকার হয়, সেটাই হবে আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।
রওশানির উদ্ভাবনী চিন্তাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো.আব্দুল মালেক তিনি বলেন,ছাত্রীরা এখন শুধু পাঠ্য বইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, তারা বাস্তব জীবনের সমস্যা নিয়ে ভাবছে এবং সমাধান খুঁজছে। রওশানির উদ্ভাবন আমাদের গর্বিত করেছে। আমরা তাকে সর্বাত্মক সহায়তা করবো, যাতে সে এই কিট আরও উন্নত করতে পারে ও ভবিষ্যতে বড় পরিসরে উপস্থাপন করতে পারে।
বিদ্যালয়ে আয়োজিত এক প্রজেক্ট প্রদর্শনীতে রওশানি তার উদ্ভাবিত কিট উপস্থাপন করলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবকরা ব্যাপক আগ্রহ দেখান। অনেকে মনে করছেন,এই উদ্ভাবন সঠিক সহায়তা পেলে স্থানীয় পর্যায়ে গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য কার্যকর একটি প্রযুক্তি হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় ভাবে এই উদ্ভাবনের প্রশংসা মিলছে চারদিক থেকে। বিশেষ করে পরিবেশ বান্ধব ও খরচ সাশ্রয়ী প্রযুক্তির প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকায় রওশানির মতো ক্ষুদে উদ্ভাবকদের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।