
উন্নয়নের নামে পরিবেশ হত্যাযজ্ঞ: অবৈধ ইটভাটায় হুমকিতে জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
প্রতিবেদক,ময়মনসিংহঃ বাংলাদেশ আজ এক গভীর অথচ নীরব পরিবেশ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের নামে, নির্মাণের চাপে এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে দেশের আনাচে-কানাচে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে হাজার হাজার ইটভাটা—যার একটি বড় অংশই অবৈধ। ময়মনসিংহ জেলা এই সংকটের একটি প্রকট উদাহরণ হলেও বাস্তবে একই চিত্র বিরাজ করছে সারাদেশজুড়ে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে,ময়মনসিংহ সদর,ফুলবাড়ীয়া,তারাকান্দা,
ফুলপুর,ত্রিশাল,ভালুকা,ফুলবাড়িয়া,মুক্তাগাছা,গফরগাও,গৌরীপুর,ঈশ্বরগঞ্জ,নান্দাইলসহ বিভিন্ন উপজেলায় ইটভাটার বড় একটি অংশ—কৃষিজমিতে অবস্থিত নদী,খাল ও জলাশয়ের কাছাকাছি জনবসতির পাশেই পরিবেশগত ছাড়পত্র ও বৈধ লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত! এই অবস্থা শুধু স্থানীয় নয়–ঢাকা,গাজীপুর,
নারায়ণগঞ্জ,সাভার,টাঙ্গাইল,কুমিল্লা,যশোর,খুলনা,রংপুর,রাজশাহী সহ দেশের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই অবৈধ ইটভাটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। আইন আছে,আদালতের রায় আছে—কিন্তু বাস্তবায়ন কোথায়? বাংলাদেশে ইটভাটা নিয়ন্ত্রণে সুস্পষ্ট আইন ও আদালতের একাধিক নির্দেশনা বিদ্যমান। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী—আবাদযোগ্য কৃষিজমিতে ইটভাটা স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া ইটভাটা অবৈধ। অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান
এছাড়া—পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-স্পষ্ট ভাবে পরিবেশ দূষণকারী যেকোনো শিল্পকারখানা নিষিদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের হাইকোর্ট বিভাগ একাধিক রায়ে—নদী,কৃষিজমি ও বসতবাড়ির পাশে অবৈধ ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। পরিবেশ ছাড়পত্রবিহীন ভাটাকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন–বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশনা দিয়েছেন। পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বলেছেন–তবুও বাস্তব চিত্র বলছে—এই আইন ও রায় কার্যত মাঠপর্যায়ে প্রতিফলিত হচ্ছে না। অভিযান কেন ব্যর্থ হচ্ছে? দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে—ভ্রাম্যমাণ আদালত ও অভিযান খণ্ডিত ও সাময়িক! জরিমানা বা আংশিক ভাঙচুরের পরপরই ভাটা পুনঃস্থাপিত হচ্ছে! দুর্গম এলাকায় ছড়িয়ে থাকা ভাটা গুলোতে নিয়মিত নজরদারি সম্ভব নয়–জরিমানাকে মালিকরা ব্যবসার খরচ হিসেবে নিচ্ছেন! ফলে অভিযানের নামে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও জনস্বার্থে টেকসই কোনো সুফল মিলছে না—বরং অবৈধ কার্যক্রম আরও সংগঠিত হচ্ছে। কৃষি,জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ—তিন দিকেই সর্বনাশ! কৃষিঃ উর্বর টপসয়েল কেটে নেওয়ায় জমি চাষের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। জনস্বাস্থ্যঃ কালো ধোঁয়া ও বিষাক্ত কণায়-হাঁপানি,শ্বাসকষ্ট,
ফুসফুসের রোগ বাড়ছে,শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে! পরিবেশ ও জলবায়ুঃ অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ-বন উজাড় করে কাঠ পোড়ানো নদীভাঙন ও জলাশয় ধ্বংস! পরিবেশবিদদের মতে,এই অবস্থা চলতে থাকলে দেশের পরিবেশগত ক্ষতি এক সময় অপরিবর্তনীয় পর্যায়ে পৌঁছাবে। সচেতন মহলের স্পষ্ট মত: প্রজ্ঞাপন ছাড়া বিকল্প নেই-পরিবেশ বিশেষজ্ঞ,
আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অভিন্ন মত—“জেলা প্রশাসন বা পরিবেশ অধিদপ্তরের একক অভিযানে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় পর্যায়ে কঠোর প্রজ্ঞাপন জারি করাই একমাত্র কার্যকর পথ।” প্রজ্ঞাপন জারি হলে—একযোগে সব অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করা সম্ভব হবে। বিদ্যুৎ,গ্যাস ও কাঁচামাল সরবরাহ বন্ধ করা যাবে। পুনঃস্থাপনে কঠোর ফৌজদারি ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে।
সরকারি অর্থ অপচয় কমবে। –রাষ্ট্রের প্রতি সময়োপযোগী আহ্বানঃ দীর্ঘ অনুসন্ধান,আইনি বিশ্লেষণ ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা একটাই কথা বলছে—অভিযান নয়,রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তই এখন সময়ের দাবি। জনস্বার্থ,পরিবেশ সুরক্ষা ও আদালতের নির্দেশনার প্রতি সম্মান জানিয়ে—
অবিলম্বে জাতীয় পর্যায়ে প্রজ্ঞাপন জারি–অবৈধ ইটভাটার স্থায়ী উচ্ছেদ। পরিবেশবান্ধব বিকল্প নির্মাণ সামগ্রীতে বিনিয়োগ। আজ যদি এই সিদ্ধান্ত না আসে,তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বহন করতে হবে আজকের এই নীরব অবহেলার ভয়াবহ মূল্য।