টঙ্গীতে ছিনতাইকারীর বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে জনতা।
গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি:
গাজীপুরের টঙ্গী এক সময়ের শান্ত শ্রমিকনগরী, আজ সে যেন আতঙ্কের নগরী। গত তিন মাস ধরে একের পর এক ছিনতাই, হামলা ও খুনের ঘটনায় পুরো শহর অচেনা, উদ্বিগ্ন ও অস্থির। ভোর, দুপুর কিংবা গভীর রাত কোনো সময়ই নিরাপদ নয়। ফ্যাক্টরি থেকে ফেরা শ্রমিক, কলেজের ছাত্রছাত্রী, দোকানি, রিকশাচালক সবাই একরকম ভয় নিয়ে রাস্তায় হাঁটে। আর এই ভয়, ক্ষোভ ও দীর্ঘদিনের দুঃসহ অভিজ্ঞতার বিস্ফোরণ ঘটল আজ উত্তাল প্রতিবাদে ফেটে পড়ল টঙ্গী। আজ বিকেলে চেরাগ আলী মোড় থেকে টঙ্গী কলেজ গেইট ও ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্ট সব জায়গায় জনস্রোত। মানুষের হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে ক্ষোভ, চোখে আতঙ্ক আর বাঁচার আকুতি। রাজনৈতিক দলের নেতা, শ্রমিক, কলেজ ছাত্রছাত্রী, ব্যবসায়ী, রিকশাচালক সকলেই দাঁড়ালেন একই কাতারে। শ্লোগান একটাই টঙ্গীকে বাঁচাতে হবে, মানুষের জীবন রক্ষা করতে হবে। প্রধান মানববন্ধন আয়োজন করে টঙ্গী পশ্চিম থানা বিএনপি, নেতৃত্ব দেন সংগঠনের আহ্বায়ক প্রভাষক বশির উদ্দিন। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি দ্রুত ছিনতাইকারীদের ধরতে না পারে, জনগণই নিজেদের রক্ষায় রাস্তায় নামবে। প্রতিদিন রক্ত ঝরতে থাকবে এটা আর সহ্য করা হবে না। পাশে থাকা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক প্রত্যয় বেপারী বলেন, “টঙ্গী এখন মৃত্যুপুরী। কলেজের সামনে দাঁড়ালেই ভয় লাগে। যুবসমাজ আজ রাস্তায় নেমে জানিয়েছে টঙ্গী আর অপরাধীদের হাতে থাকবে না।
গত দুদিন আগে সিদ্দিকুর রহমান হত্যাকাণ্ড আজকের এই প্রতিবাদের আগুনকে আরও উসকে দিয়েছে। সকালে অফিসে যাওয়ার পথে বাটা গেট ফ্লাইওভারে ছিনতাইকারীদের হামলায় তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তার মৃত্যুতে শোক, বেদনা আর ক্ষোভে টঙ্গীর মানুষ স্তব্ধ। আজ নিহতের পরিবার জিএমপি কমিশনার কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে প্রশ্ন ছুড়েছেন একজন নিরীহ মানুষ কি অফিসে যেতে পারবে না? কেন তার হত্যাকারীরা এখনও ধরা পড়ল না?” এদিকে র্যাব-১ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাকিব হাসান জানিয়েছেন, সিদ্দিকুর হত্যা মামলার প্রধান সন্দেহভাজন ছিনতাইকারী ইমরানকে মাজার বস্তি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। টঙ্গী সরকারি কলেজের সামনে বাংলাদেশ ইউথ রেভোলিউশন (BYRL)-এর ব্যানারে আরও একটি বৃহৎ মানববন্ধন হয়। তরুণদের মুখে ক্ষোভ, ভীতির ছাপ এবং পরিবর্তনের দাবি স্পষ্ট। এক ছাত্র কাঁদতে কাঁদতে বলেন ক্লাস শেষে গেইটে দাঁড়াতে ভয় হয়। ফোন আছে কিনা দেখি না—পেছনে কে দাঁড়িয়েছে সেটা দেখি আগে।” কলেজের এক শিক্ষক বলেন—“শিক্ষার্থীরা ভয় নিয়ে বাঁচে—এটা একটি সমাজের সবচেয়ে লজ্জাজনক অবস্থা। অপরাধ দমনে সাফ বার্তা দিয়েছেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি ও সদ্য প্রমোশনপ্রাপ্ত ডিআইজি জাহিদুল হাসান। সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, ছিনতাইকারী ও মাদকের বিরুদ্ধে আমি জিহাদ ঘোষণা করেছি। কোনো অপরাধী ছাড় পাবে না। শরীরে রক্ত থাকা পর্যন্ত অপরাধীদের সঙ্গে আপসের প্রশ্নই আসে না।” তিনি জানান, গতরাতে ডিসি ক্রাইম মহিউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে ব্যাপক অভিযান চালিয়ে কয়েকজন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে দ্রুত জামিন এবং সাক্ষীর অনীহা বড় বাধা বলেও উল্লেখ করেন তিনি। টঙ্গীর মানুষের ভয় সবচেয়ে বেশি তিনটি এলাকায় টঙ্গী বাজার রোড, ফায়ার সার্ভিস মোড় এবং টঙ্গী রেলস্টেশন। প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই এই এলাকাগুলো ছিনতাইকারীদের প্রধান আস্তানা হিসেবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। দোকানি দেলোয়ার হোসেন বলেন, দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরতে গেলেই মনে হয় বাঁচবো তো? টাকা-মোবাইল দিয়েও রেহাই পাই না। রিকশাচালক আব্দুল খালেক বলেন, রাতে আমরা যাত্রী নেই না। মারধর করে রিকশা নিয়ে যায়। এক নারী গার্মেন্টস শ্রমিক চোখ ভিজিয়ে বলেন, “দুইবার ছিনতাই হয়েছে। ৮টার পর রাস্তায় বের হলেই মনে হয় আর বাসায় ফিরতে পারবো না।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে টঙ্গীর আশপাশের বস্তিগুলো এখন কিশোর গ্যাং, ছিনতাইকারীদের ‘নিরাপদ ঘাঁটি’। বয়স ১৬ থেকে ৩০। অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ব্লেড, ছুরি, রড এমনকি রক্তমাখা বালতিও। তারা কয়েক সেকেন্ডে আক্রমণ করে পালিয়ে যায়। পেছনে রয়েছে মাদক ব্যবসায়ী ও দালালচক্র, যারা দূর থেকে পুরো নেটওয়ার্ক চালায়। টঙ্গীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজ উত্তপ্ত। কেউ লিখেছেন রাতে বাসায় ফিরলে মনে হয় বেঁচে ফিরলাম। আরেকজন লিখেছেন সিদ্দিকুরের মতো আর কত ভাইকে মরতে হবে অনেকেই বলছেন অপরাধীরা পরিচিত মুখ কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলে না, প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় তারা বড় হয়। প্রতিদিন এখানে ৬–৭ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। বেতন পেয়ে বাসায় ফেরার পথটাই সবচেয়ে দুঃসহ। একজন শ্রমিক বলেছেন, “মাসের টাকা নিতে গিয়েও ভয় পাই বাড়ি ফিরতে পারবো তোনধীরে ধীরে টঙ্গী হয়ে উঠছে এক যুদ্ধক্ষেত্র যেখানে প্রতিদিন টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছে সাধারণ মানুষ। মানববন্ধনে সাধারণ মানুষ কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন সিদ্দিকুর রহমান হত্যার আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার, টঙ্গীর তিন হটস্পটে স্থায়ী পুলিশ টহল, অন্ধকার এলাকায় আলো দেওয়া, সিসিটিভি স্থাপন, এবং মাদকচক্রের গডফাদারদের গ্রেপ্তার। পাশাপাশি পুলিশের যেসব সদস্য দায়িত্বে অবহেলা করছেন—তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে। জনতার কণ্ঠে ছিল একটাই বার্তা আর কোনো মা যেন ছেলের লাশ না দেখে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন রয়ে যায় টঙ্গী কি জেগে উঠেছে? আজকের জনস্রোত বলছে হ্যাঁ। টঙ্গী আর অপরাধীদের দখলে থাকবে না। মানুষ নিরাপত্তা চায়, জীবনের অধিকার চায়। জনগণের ঐক্য আর পুলিশের সদিচ্ছা মিললেই টঙ্গী আবার ফিরে পেতে পারে তার হারানো শান্তি যে শান্তি একসময় এটিকে জীবিকার শহর বানিয়েছিল, আজ যা মৃত্যুভয়ের নগরীতে পরিণত হয়েছে।
উপদেষ্টাঃ আনোয়ার হোসেন , সম্পাদক/ প্রকাশক: মোঃ কামরুল ইসলাম , বার্তা সম্পাদকঃ মুনীর হোসেন চৌধুরী । সম্পাদকীয় কার্য্যালয়ঃ সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা -১০০০।। মোবাইল: ০১৯২৮৮২৯৮৬৩
© All rights reserved © 2024 ঢাকার ক্রাইম